নিজস্ব প্রতিবেদক : সাম্প্রতিক ক্ষমতাচ্যুত প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বছরের পর বছর ধরে অন্যায় অপকর্মের দায় বর্তাচ্ছে এখন অধিনস্ত নিরীহদের ওপর। রাজনৈতিক নেতাদের দ্বারা সংঘটিত ঘটনাগুলো ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য একটি মহলকে তারা নিজেরাই ব্যবহার করছেন। গত কয়েকদিনে সারাদেশের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর চিত্র পর্যালোচনা করলে এর শতভাগ প্রমাণ মিলবে। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধানরা স্থানীয় প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক নেতাদের কাছে জিম্মি যুগের পর যুগ। সংবাদপত্রের যারা নিয়মিত পাঠক, নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছেন, স্কুল-কলেজে ম্যানেজিং কমিটি গঠন নিয়ে সংঘর্ষ, এমনকি খুনের ঘটনাও অহরহ ঘটেছে। গত এক যুগে মাত্রাতিরিক্তভাবে বেড়েছে এমন ঘটনা।
বস্তুত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিচালনা কমিটির সভাপতি কিংবা অভিভাবক সদস্য হতে পারলেই প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের জিম্মি করে, কোন কোন ক্ষেত্রে প্রধানের সাথে লিয়াজু করেও অপকর্মের রাজত্ব কায়েম করা যায়। কিন্তু মেয়াদ শেষে ম্যানেজিং কমিটি নিজেদের আখের গুছিয়ে নিয়ে পালিয়ে গেলেও তাদের অপকর্মের সম্পূর্ণ দায় বহন করতে হয় নিরীহ প্রতিষ্ঠানপ্রধানকে। গত এক মাসে সারাদেশে হাজার হাজার প্রধান শিক্ষক ও অধ্যক্ষ লাঞ্ছিতের ঘটনা দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য অশনিসংকেত।
বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন শেষে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষা-কার্যক্রম শুরু হলে পাবনার বেড়া উপজেলার নাটিয়াবাড়ি ধোবাখোলা করোনেশন স্কুল এন্ড কলেজের অধ্যক্ষ আবু বকর সিদ্দিককে পদত্যাগের জন্য চাপ দেয় স্থানীয় কিছু নেতৃবৃন্দ। এতে আবু বকর সিদ্দিক পদত্যাগ করতে সম্মত না হওয়ায় একটি স্বার্থান্বেষী মহল স্থানীয় কিছু শিক্ষার্থীকে ভুল বুঝিয়ে স্কুলের ক্লাস বন্ধ করে আন্দোলন ও বিক্ষোভ মিছিল করায়। অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ আনে তারা। অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে কিছু শিক্ষকের ওপরও চাপ সৃষ্টি করেন। এভাবেই বেশ কিছুদিন ধরে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি বিরাজ করছে ওই প্রতিষ্ঠানে। শিক্ষকদের অভিযোগ- কিছু বহিরাগত ও রাজনৈতিক স্বার্থান্বেষী মহল প্রতিষ্ঠানের সুনাম নষ্টের জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। কয়েক বছর আগে অত্র প্রতিষ্ঠান ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারী নিয়োগ পরীক্ষায় নিয়োগ বঞ্চিত প্রার্থীরা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে এ ধরণের উদ্ভূত পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে। তারা আরও জানান, গত ১ যুগে অত্র প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন মেয়াদে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন সাবেক সংসদ সদস্য খন্দকার আজিজুল হক আরজু, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মরহুম আব্দুল কাদের ও জাতসাখিনী ইউপি চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ মানিক। তারা প্রত্যেকেই সভাপতির দায়িত্ব পালনকালে নিজেদের পছন্দের প্রার্থীদের চাকরী দিতে অধ্যক্ষকে বাধ্য করেছেন। অথচ এখন নিয়োগ বঞ্চিত প্রার্থীরা উদোর পিণ্ডি বুদোর ঘাড়ে চাপিয়ে দিচ্ছে। গভর্নিং বডির উল্লিখিত সাবেক সভাপতিবৃন্দ নিজেদের গা বাঁচাতে অভিযোগের তীর ছুঁড়ছেন স্বয়ং অধ্যক্ষের দিকে। অথচ একজন অধ্যক্ষের পক্ষে কখনও দূর্নীতি করা সম্ভব নয়, যদি না সভাপতিসহ অন্য সদস্যরা তাকে ব্যবহার করেন।
ওই কলেজের কয়েকজন শিক্ষক জানান, ”বহিরাগত কিছু লোকজন প্রতিষ্ঠানের ভিতরে শ্রেণিকক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের জোর পূর্বক বের করে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে আন্দোলন করায়। যেটা আমাদের কাম্য নয়।
প্রধান শিক্ষক আবু বকর সিদ্দিক বলেন, “বর্তমানে আমি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। আমাকে মিথ্যা অভিযোগে ফাঁসানোর চেষ্টা করছে একটি মহল। কিছু শিক্ষার্থীকে মিথ্যা ও বানোয়াট কথাবার্তা বলে আমার বিরুদ্ধে উস্কে দিয়ে আন্দোলন করিয়েছে। আমার কাছ থেকে জোর করে পদত্যাগপত্রে সই নেবার পায়তারা করছে তারা। এদের মধ্যে কেউ কেউ আমার জানমালের ক্ষতি করতে পারে বলে আমিসহ অনেকেই আশংকা করছি।”
এদিকে অধ্যক্ষ আবু বকর সিদ্দিকের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থী আন্দোলন অনুষ্ঠিত হলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। তাঁর সাবেক শিক্ষার্থীসহ স্থানীয় নাগরিক কমিটির পক্ষ থেকে তীব্র নিন্দা জানানো হয়। ডিজিটাল কন্টেন্ট ক্রিয়েটর খন্দকার ইসমাইল হোসেন নামের এক ব্যক্তি তার ফেসবুক পোস্টে বলেন, “আবু বকর স্যারকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি। তিনি যেমন একজন আদর্শ শিক্ষক তেমনই আমাদের গ্রামের একজন গর্বিত সন্তান। আমরাও গর্বিত এমন একজন শিক্ষক আমাদের গ্রামে জন্ম নিয়েছেন। স্যার এর পদত্যাগের জন্য যে ৪৮ ঘন্টার আল্টিমেটাম দিয়েছে, আমি আসলে বুঝে উঠতে পারছি না যে এরা আসলে কারা… এরা কি আসলেও স্যার এর থেকে কোনোদিন সঠিকভাবে জ্ঞান নিয়েছে? স্কুল ফাঁকি দেওয়া আর বখাটে মার্কা ছাত্ররাই স্যার এর পদত্যাগের দাবী করতে পারে বলে আমার মনে হয়। অথবা স্যারের জায়গা অন্য কেউ দখল করতে চায়। স্থানীয় একজন এমপি, একজন সভাপতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে স্কুল-কলেজের প্রধান কি চাকরি করতে পারে?
তিনি তার ফেসবুকে আরও বলেন, ধরতে চাইলে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতিকে ধরুন- দায়ী কে অনায়াসে বেরিয়ে আসবে।”
কথাসাহিত্যিক শেখ শামীম সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মন্তব্য করেন, “বকর স্যার সম্পূর্ণ ষড়যন্ত্রের শিকার। নিঃসন্দেহে তিনি মানবিক ও সৎ মানুষ। তাঁর বিরুদ্ধে এমন ষড়যন্ত্রের তীব্র ঘৃণা ও প্রতিবাদ জানাই।”
বর্তমান সময়ের আলোচিত চলচ্চিত্র পরিচালক রফিক সিকদার লেখেন, “তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন করছি। বকর স্যারের মতো আদর্শবান এবং সৎ চরিত্রের শিক্ষক আমার জীবনে দেখিনি।”
খলিলুর রহমান নামের একজন আর্মি অফিসার (কমিশনপ্রাপ্ত) লেখেন, “আমি বকর স্যারের একজন ছাত্র। শিক্ষক হিসেবে স্যার আমাকে ৯৩ সাল থেকে চিনেন। সেই সুবাদে আমিও জানি। স্যার অত্যন্ত বিনয়ী, নম্র ভদ্র ও স্নেহশীল একজন মানুষ। স্যারের সহযোগিতা ও অনুপ্রেরণায় আজ আমি সুপ্রতিষ্ঠিত। বর্তমানে আমি জুনিয়র কমিশন অফিসার হিসেবে কর্মরত আছি। যেটা স্যারের অনুপ্রেরণা ও সহযোগিতা না পেলে আজ এই সফলতা সম্ভব হতো না। আমার জানামতে স্যার নিঃস্বার্থভাবে শুধু আমাকে নয় আরো ছাত্র-ছাত্রীকেও এমন সহযোগিতা ও অনুপ্রেরণা দিয়ে যাচ্ছেন। এমন একজন শিক্ষককে বাধ্যতামূলক অবসর করানো হলে আমি মনে করি ছাত্র সমাজ কলুষিত হওয়ার গ্লানি বহন করবে। আমরা কারো প্ররোচনায় ব্যবহৃত না হয়ে আসুন নিজের বিবেক বুদ্ধি খাটিয়ে কাজ করি।”
সানজিদা খাতুন মিথিলা নামের একজন ফেসবুক ব্যবহারকারী লেখেন, “বকর স্যার অনেক ভালো মানুষ। কারা এই আন্দোলন করছে? তারা হয় পড়া চোর, নয়তো নেশাখোর। প্রকৃত ছাত্রছাত্রী এসব করতে পারে না। ওইসব ছাত্রদের স্কুল থেকে বের করে না দিয়ে সুশিক্ষিত করতে বকর স্যারকে থাকতে হবে।তা না হলে কিছুদিন পরে ওইসব ছাত্র স্কুলে থাকতে পারবে না। আসলে ছাত্ররাও ষড়যন্ত্রের শিকার। ওরা বুঝতে পারছে না- ওদের ভুল বুঝিয়ে ব্যবহার করা হচ্ছে।”
মো. হারুণ নামের একজন এ ঘটনায় তীব্র সমালোচনা করে বলেন, “একজন আদর্শবান শিক্ষককে, যে সমস্ত ছাত্র এবং ছাত্রী পদত্যাগ চাচ্ছে, তারা হচ্ছে এ যুগের কলঙ্ক নামের ছাত্র এবং ছাত্রী। এর পিছনে আছে দুষ্কৃতিকারক নামের অমানুষ, এই সমস্ত অমানবিক চাওয়া পাওয়া একদিন ধূলিসাৎ হয়ে যাবে।”
বর্তমানের উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে দেশব্যাপী আলোচনা সমালোচনার ঝড় উঠছে। সমাজের সচেতন নাগরিক কমিটির প্রায় সকলেরই এক কথা- পদত্যাগে বাধ্য হওয়া প্রধানদের বিরুদ্ধে অনলাইনে ভেসে বেড়ানো শিক্ষার্থীদের অভিযোগগুলো শুনে বলুন তো দেখি, এসব ক্ষেত্রে সভাপতি/কমিটি বা অভিভাবক হিসেবে আপনার দায় কতটুকু আর প্রতিষ্ঠান প্রধানের দায় কতটুকু? প্রতিষ্ঠান প্রধানের বিরুদ্ধে যে সমস্ত অভিযোগ/অনুযোগ বাতাসে ভেসে বেড়ায় এর বেশিরভাগ অংশ ভেতর কিংবা বাহিরের কোনো না কোনো কোন্দল কিংবা হিংসুটে ব্যক্তির অপপ্রচারের ফল। একটু খোঁজ নিলেই জানার কথা। এরপরও যদি কেউ বলে- কমিটিসহ মিলেমিশে দুর্নীতি হয়েছে। এই ক্ষেত্রেও প্রতিষ্ঠান প্রধান অপারগ। আপনি হলেও কি এই পরিস্থিতিতে কমিটির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে দুর্নীতি রোধ করে নিজের চাকরিটা রক্ষা করতে পারতেন?