প্রফেসর আলতাফ হোসেন সরকার
৮ সেপ্টেম্বর ১৯৯৬ সালকে ওয়ার্ল্ড কনফেডারেশন ফর-ফিজিওথেরাপি (ডাব্লিউসিপিটি), বিশ্ব ফিজিওথেরাপি দিবস হিসেবে ঘোষণা করেছে। ১৯৫১ সালের ৮ সেপ্টেম্বর ওয়ার্ল্ড কনফেডারেশন ফর ফিজিওথেরাপি-এর জন্ম হয়।
বিগত কয়েক বছর যাবৎ বাংলাদেশের ফিজিওথেরাপি চিকিৎসকগণ এই বিশ্ব ফিজিওথেরাপি দিবসটিকে বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে পালন করে আসছেন। এরই ধারাবাহিকতায় আজও রয়েছে র্যালি, সেমিনার, আলোচনা সভা, ফ্রি হেল্থ ক্যাম্প এবং স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচি।
এবারে ২০২৪ সালে বিশ্ব ফিজিওথেরাপি দিবসের পতিপাদ্য বিষয় হলো কোমর ব্যথায় ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা।
আমরা যদি বাংলাদেশে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস পর্যালোচনা করি তাহলে দেখতে পাই যে, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের পূনর্বাসনের জন্য ১৯৭৩ সালে বিএসসি ইন ফিজিওথেরাপি শিক্ষা কার্যক্রম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা অনুষধের অধীনে তৎকালীন পঙ্গু ও পুনর্বাসন হাসপাতালে (বর্তমানে নিটোর) স্কুল অব ফিজিওথেরাপি এন্ড অকুপেশনাল থেরাপি প্রতিষ্ঠানে শুরু করা হয়।
এরই ধারাবাহিকতায় এবং দেশের চাহিদা পুরনের জন্য ১৯৯৬ সালে দি পিপলস ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশ হেল্থ প্রফেশনাল ইনস্টিটিউট (সি.আর.পি.) সাভার, ১৯৯৯ গণস্বাস্থ্য সমাজভিত্তিক মেডিকেল কলেজ, মির্জানগর, সাভার, ২০০২ সালে স্টেট ইউনিভার্সিটি এবং অন্যান্য ইনস্টিটিউট এই কার্যক্রম শুরু করে। বর্তমানে গণস্বাস্থ্য সমাজ ভিত্তিক মেডিকেল কলেজ এবং বাংলাদেশ হেল্থ প্রফেশনাল ইনস্টিটিউট মাস্টার্স অব ফিজিওথেরাপি শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করেছে, সেখানে দেশি-বিদেশী ছাত্র-ছাত্রীরা লেখা পড়া করার সুযোগ পাচ্ছে ।
২০০১ সালে প্রথম ফিজিওথেরাপি শিক্ষা এবং চিকিৎসার উপর গবেষণা পত্র বাংলাদেশ ফিজিওথেরাপি জার্নালে, বাংলাদেশ ফিজিওথেরাপি এ্যাসোসিয়েশনের তত্ত্বাবধায়নে প্রকাশ হয়।
৪৬০ বি সি তে- ব্যথা, স্ট্রেস এবং ক্ষত নিরাময়ের জন্য ফিজিওথেরািপ চিকিৎসা কার্যক্রম শুরু করা হয়। ১৮১৩ সালে ফিজিওথেরাপি পেশা হিসেবে সুইডেন এ আত্মপ্রকাশ করে। এ ছাড়াও মেনিপুলেশন পদ্ধতির মাধ্যমে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা কার্যক্রম শুরু হয়। ১৮৯৪ সালে গ্রেট ব্রিটেন চাটার্ড সোসাইটি অব ফিজিওথেরাপি সংস্থা তৈরী করে। ১৯১৩ সালে নিউজিল্যান্ড এর অটিগো বিশ্ববিদ্যালয় স্কুল অব ফিজিওথেরাপি প্রতিষ্ঠা করে। তারপর ১৯১৪ সালে রিট কলেজ আমেরিকাতে ফিজিওথেরাপি শিক্ষা কার্যক্রম চালু করা হয়। বিশ্ব উন্নয়নের ধরাবাহিকতার সাথে তাল মিলিয়ে এবং ১৯৮০ দশকে কম্পিউটার এবং টেকনোলজির উন্নয়ের সাথে সাথে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা ও গবেষণার অনেক উন্নয়ন সাধিত হয়।
এখন সারাবিশ্বে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসার গুরুত্ব অত্যান্ত সমাদ্রিত। যেমন সারা বিশ্বে স্পোর্টস মেডিসিনে ফিজিওথেরাপিষ্ট ই প্রথম কনটাক্ট চিকিৎক। অন্যান্য বিশেষায়িত শাখা যেমন স্পাইনাল ডিসফাংশন, মাসকিলো-স্কেলিটাল ডিসফাংশন, কার্ডিওভাসকুলার এন্ড চেস্ট ডিজিজেস, নিউরোলজি এবং নিউরো সার্জারী, শিশু রোগে, প্রসূতি ও স্ত্রীরোগে এবং অর্থোপেডিক মেডিসিন এবং অর্থোপেডিক সার্জারী ছাড়াও অন্যান্য শাখায় ফিজিওথেরাপি চিকিৎসক গণ সুনাম ও সফলতার সহিত চিকিৎসা করছে। বিশেষ করে ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (আইসিইউ) চেষ্ট ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা সার্বক্ষণিক দিয়ে আসছে। সুতরাং এই পেশা জীবন রক্ষার ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
পৃথিবীর বিভিন্ন উন্নতর গবেষণায় বলা হয়েছে, চিকিৎসা বিজ্ঞানের দ্রুত প্রসারের সাথে সাথে উপরে বর্ণিত বিভিন্ন অসুস্থতার জন্য ছাড়াও ব্যাকপেইন, নেক পেইন, সার্ভিকো জেনিক হেডেক, স্পাইনাল কর্ড ইঞ্জুরি রোগের পূনর্বাসনের জন্য ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমি মনে করি উপরোক্ত কষ্ট থেকে নিরাময়ের জন্য শুধু ঔষধ নয়। ঔষধের পাশাপাশি সঠিক ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা অবশ্যই গ্রহণ করুন এবং কষ্টমুক্ত থাকুন এবং প্রতিরোধ করুন। দৈনিন্দন জীবনে কাজ-কর্ম এবং চলেফেরায় সঠিক ভঙ্গি মেনে চলবেন। মনে রাখবেন, ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা অনেক রোগ প্রতিরোধ করতেই পারে তন্মোদ্বে ব্যাকপেইন, নেক পেইন অন্যতম। আর সেজন্যই আমাদের দায়িত্ব ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা সেবা দেশের আর্থপীড়িত জণগনের দোড়গোড়ায় পৌছে দিতে হবে। আমাদের ফিজিওথেরাপি চিকিৎসকগণকে আরও উন্নতর শিক্ষায় শিক্ষিত করে বিদেশে পাঠিয়ে আমরা আনতে পারি দেশের জন্য অঢেল বৈদেশিক মুদ্রা।
অবশেষে বলা যায় যে, আজকের এই শুভক্ষণে দেশের অগণিত রোগীদের কষ্ট উপশমের লক্ষ্যে সরকারি ফিজিওথেরাপি কলেজ প্রতিষ্ঠা, ফিজিওথেরাপি কাউন্সিল প্রতিষ্ঠা এবং উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত ফিজিওথেরাপি চিকিৎসকদের পদ সৃষ্টির জন্য সরকারের কাছে বিশেষ অনুরোধ করছি।
প্রফেসর আলতাফ হোসেন সরকার
ব্যাকপেইন বিশেষজ্ঞ
০১৭৬৫৬৬৮৮৪৬, ০১৭৮৫৯৯৯৯৭৭